প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

BRAC মানে কী?
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে BRAC যখন প্রথম ছোট আকারে ত্রান ও পূনর্বাসন প্রকল্প শুরু করেছিল, তখন এর নাম ছিল বাংলাদেশ পূনর্বাসন সহায়তা কমিটি (বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিসটেন্স কমিটি)। পরে যে নাম পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল উন্নয়ন কমিটি (বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি) হয়। এরপর আমরা আমাদের কার্যক্রম শুধু গ্রামে নয়, শহর এলাকাতেও বিসত্মৃত করেছি। সম্প্রতি আমরা আমাদের কার্যক্রম এশিয়া ও আফ্রিকার আরও কিছু দেশ; যেমন আফগানিসত্মান বা তানজানিয়ায় বিসত্মৃত করেছি। ফলে এখনকার এই সময়ে আমাদের সংস্থার নাম স্রেফ BRAC; যার আর আদ্যাক্ষর-সমন্বিত কোনো অর্থ নেই।

ক্ষুদ্র-অর্থায়ন (মাইক্রোফিনান্স) বিষয়ে অন্যদের চেয়ে BRAC-এর দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা কেন?
অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্রাকের একটি অন্যতম সংযোজন হল মাইক্রোফিনান্স। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লাভজনক কর্মকান্ড ও ক্ষুদ্রব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করে এবং এই ক্ষেত্র বাড়িয়ে তাদের আয়বৃদ্ধি তরান্বিত করতে ১৯৭৪ সালে ব্র্যাক এই ক্ষুদ্র অর্থনীতির সূচনা করে। বাংলাদেশের আরও কিছু ক্ষুদ্র-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের (এফআই) মতো ব্র্যাকের মাইক্রোফিনান্সও জামানত-মুক্ত ঋন দিয়ে থাকে এবং সদস্যদের কাছ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋনের কিসিত্ম আদায় করে।

যাই হোক, ব্র্যাকের মাইক্রোফিনান্স কার্যক্রম অন্যান্য মাইক্রোফিনান্স কার্যক্রমের থেকে বেশ কিছু দিক দিয়ে ভিন্নতর। সেগুলোর মধ্যে আছে-

উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বিত কার্যক্রমে অংশগ্রহনের সুযোগ:
উন্নয়নের ব্যাপারে ব্র্যাকের যে সর্বাত্মক মনোভাব তাতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন অনত্মর্ভূক্ত। ব্র্যাকের যে কোনো একটি উদ্যোগের সুফলভোগী যে কেউ, এমনকি মাইক্রোফিনান্সের সদস্যরাও অনায়াসে ব্র্যাকের অন্য যে কোনো প্রকল্প ও সেবায় অংশ নিতে পারেন। যাই হোক, এটা উলেস্নখ করা দরকার যে, ব্র্যাকের মাইক্রোফিনান্স সদস্যদের অন্য কোনো ব্র্যাক প্রকল্পে অংশ নেওয়ায় কোনো বাধা নেই। বরং এসব প্রকল্প সমাজের সকল যোগ্য মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

ঋন-সিড়ি:
সমাজে বিভিন্ন সত্মরের দারিদ্র আছে বলে ব্র্যাক মাইক্রোফিনান্স প্রকল্প বিভিন্ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ করে বহুবিধ ধরণের ঋন দিয়ে থাকে।  তাদের সর্ববৃহৎ ঋনকার্যক্রমনের নাম হল-দাবি; একেবারেই দরিদ্র ঋনগ্রহিতাদের প্রকল্প। দাবি-গ্রহিতারা নিজেদেরকে প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে উন্নীত করে ফেলতে পারেন। যে পর্যায়ের নাম হল-উন্নতি; এই প্রকল্প আরেকটু বড় আকারের ক্ষুদ্র-ঋণ দিয়ে থাকে। তৃতীয় ঋন কার্যক্রমের নাম প্রগতি; এই কার্যক্রম ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করে থাকে এবং তাদের বর্তমান ব্যবসায় উন্নয়নে সহযোগিতা করে। এই সিড়ি দিয়ে একটি ঋন-বিহীন প্রকল্প দিয়ে চূড়ানত্ম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌছানো হয়; যেমন টার্গেটিং দ্য আলট্রা পুওর (টিইউপি) প্রোগ্রাম।   

সামনে-পেছনের সেতু:
‘ক্রেডিট-পস্নাস-পস্নাস’ ধারনার মাধ্যমে ব্র্যাক বিভিন্ন সেবার এমন একটি সমন্বিত কার্যক্রম তৈরি করেছে যাতে তার সদস্যরা যেসব জায়গায় বিনিয়োগ করছেন তার প্রতিটি উদ্যোগের সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর মধ্যে আছে পেছনের শৃঙ্খল সার্ভিস (ব্যকওয়ার্ড লিংকেজ সার্ভিসেজ)। যেমন কৌশল উন্নয়নের প্রশিক্ষন, উৎপাদন ও প্রকৌশল উন্নয়নের সুযোগ, কারিগরি সহায়তা সরবরাহ। এর সঙ্গে উৎপাদন শৃঙ্খলের সামনের দিকের কার্যক্রমও আছে। যেমন তৈরি শিল্পের উৎপাদন ও বিপননের জন্য গুদামজাতকরণের সুবিধা। ব্র্যাক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের বিসত্মৃত এক নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলে এবং তাদের প্রশিক্ষন দিয়ে থাকে। এরাই কারিগরি সহায়তা, সংরক্ষন ও দেখভালের মতো গুরুত্বপূর্ন সেবাগুলো দিয়ে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে ব্রাকের পোল্ট্রি ও গৃহপালিত পশুর টিকাদানকারীদের কথা বলা যায়। এর বাইরে ব্র্যাক অনেক বানিজ্যিক উদ্যোগ দাড় করিয়েছে। যেগুলো আসলে একটি নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করে বলে কৌশলগত কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোরই অংশ; এই উদ্যোগগুলো ব্র্যাকের সদস্যদের কোনো রকম বাজার ধ্বসের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করে। এর একটা বড় উদাহরণ হতে পারে ব্র্যাক ডেয়ারি ও খাদ্য প্রকল্প। ব্র্যাকের ‘ভিলেজ অর্গানাইজেশন’-এর যেসব সদস্য গাভীর পেছনে বিনিয়োগ করেন তাদের একটি বাজার তৈরি করে দেয়  ব্র্যাক ডেয়ারি ও খাদ্য প্রকল্প। এইসব নারী সদস্যদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে দুধ কিনে ব্র্যাক ডেয়ারি ও খাদ্য প্রকল্প নিশ্চিত করে যে তাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর উৎপাদনের একটি নিশ্চিত ও সি'র চাহিদা বজায়ে থাকবে। এই ডেয়ারী চেইনে পেছনের দিকে কার্যক্রমের মধ্যে আছে কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়া। যার ফলে বিনিয়োগকারী আরও বেশি দুধ দিতে পারা মঙ্কর প্রজাতির গাভী পেয়ে থাকেন। আছে ব্র্যাকের গৃহপালিত পশুর খাবার; যেটি গৃহপালিমত পশুকে আরও উন্নত মানের খাবার দিয়ে তার বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করে। যেসব সদস্য গাভী কেনার জন্য ঋন নেন তাদেরকে গৃহপালিত পশুর দেখভাল ও সংরক্ষনের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষন দেওয়া হয়।

ধারাবাহিক নতুনত্ব:
ব্র্যাকের প্রকল্পগুলো বহুমাত্রিক এক একটা উদ্যোগ। যেগুলো প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষন করা হতে থাকে এবং তাদের প্রক্রিয়া র প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়। ব্র্যাক এই অঞ্চলে একমাত্র সংস্থা যার নিজস্ব গবেষনা ও মূল্যায়ন বিভাগ আছে; একটি ১৯৭৫ সালে শুরু হয়েছে। এই বিভাগ আমাদেরকে বর্তমান প্রকল্পগুলোর মানোয়ন্নন এবং টার্গেটিং দ্য আলট্রা পুওর-এর মতো নতুন উদ্যোগ গ্রহনের ব্যাপারে সহায়তা করে।

ব্র্যাক কি শুধু মাইক্রোফিনান্সই করে?
না। ব্র্যাক শুধুমাত্র মাইক্রোফিনান্স নিয়েই কাজ করে না। উন্নয়নের ব্যাপারে ব্র্যাকের যে সর্বাত্মক মনোভাব তাতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবাধিকার ও আইনি সেবা অনর্ত্মভূক্ত। সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও আছে। আজকের দিনে ব্র্যাক পৃথিবীর সর্ববৃহত এনজিতে পরিণত হয়েছে। এই সংস্থায় লক্ষাধিক মানুষ কাজ করছেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় উন্নয়মূলক উদ্যোগগুলোর ভেতর দিয়ে ১২৬ মিলিয়নের ওপর মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।


ক্ষুদ্র-ঋন (মাইক্রোক্রেডিট) ও ক্ষুদ্র-অর্থায়ন (মাইক্রোফিনান্স) পার্থক্য কী?
ক্ষুদ্রঋন বলতে আসলে গ্রহকের চাহিদা অনুযায়ী তাকে ছোট আকারে ঋন দেওয়াকেই বোঝায়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র-অর্থায়ন বলতে আরও বড় আকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বোঝায়; যা আরও বেশি সাফল্যের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এসব বাড়তি অর্থায়নের উদাজরণ হিসেবে সঞ্চয়, বীমা, গৃহ-ঋন, আয় স্থানানত্মর।  স্থানীয় ক্ষুদ্র-অর্থায়ন সংস্থাগুলো আরও অনেক কাজ করতে পারে; যেমন-বানিজ্যউদ্যোগ ও জীবনের নানা দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্যানিটেশন বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, জীবনমান বাড়ানোয় সহায়তা এবং শিশুশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া।

আসলে কী দরিদ্র মানুষের পক্ষে ব্যবসা শুরু করা এবং সাফল্যের সঙ্গে চালানো সম্ভব?
অবশ্যই। বহু মানুষের এরকম অনেক দক্ষতা আছে, যা খুব দ্রুত আয় সৃষ্ঠিকারী কর্মকান্ডে পরিনত হতে পারে। সামান্য কিছু অর্থ পেলে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা, যেমন তাত, সেলাই, শস্যমাড়াই,  সবজি উৎপাদন ও বিক্রয়, মাছ ধরা ও বিক্রয়, ডিম বিক্রয়ের জন্য মুরগী পালন এবং গৃহপালিত পশুর উৎপাদন শুরু করার বা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে ফেলতে পারে। আমরা গ্রামাঞ্চলের মানুষকে পযুক্তি নির্ভর ক্ষুদ্রব্যবসা শুরুতেও সহায়তা করে থাকে; যেমন সেল ফোন বিক্রি। এর ফলে গ্রামাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ্য ও তথ্যের মূলবান দুনিয়ায় প্রবেশের সুযোগ পায়। এসব ছোট ছোট উদ্যোগ একটি প্রানচঞ্চল সামাজিক ব্যবসায় পরিণত হতে পারে।

গরীব এসব মানুষ কি ঋনের টাকা ফেরত দেয়?
হ্যা। মাইক্রোফিনান্সের গ্রহকরা ঋন পুরশোধে অসাধারণ। ঋণ ফেরত দেওয়ার শতকরা হার ৯৯.৩১। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা ঋন ও ক্রেডিট কার্ডের দেনা পরিশোধের চেয়ে এই হার বেশি। এই গ্রহাকরা আসরে তাদের জীবন মান বাড়ানোর জন্য পাওয়া সুযোগটিকে মূল্যায়ন করেন।

লোকজন কি আসলেই এই প্রক্রিয়ায় দারিদ্র-মুক্ত হয়?
মাইক্রোফিনান্স কোনো আলদীনের প্রদীপ নয়। এই প্রক্রিয়া নিজে নিজে বৈশ্বিক দারিদ্র দূর করতে পারবে না। তবে একটি সসমস্যা সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ।  মাইক্রোফিনান্স দরিদ্রদের একটি স্থির ও টেকসই আয়ের উৎস তৈরি করে দেয়; যা দিয়ে তারা নিশ্চিতভাবে দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান। এই প্রক্রিয়া একই সঙ্গে তাদের পরিবারের জন্য উন্নত জীবন যাপনের একটি সুযোগ করে দেয়। কারো কাছে উন্নতি মানে মাটির ঘর থেকে একটু কাঠের তৈরি ঘরে পৌছানো। কারো কাছে এর অর্থ উন্নত পুষ্টি গ্রহনের সুযোগ। আবার কারো কাছে এটা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য কিছু অর্থের সংস্থান।

আমি শুনেছি মাইক্রোফিনান্স প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমাত্রায় সুদ আদায় করে। আসলেই তাই?
অন্য সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মতো মাইক্রোফিনান্স প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহককে দেওয়া ঋনের ওপর সুদ নিয়ে থাকে। এই লাভের মধ্যে প্রতিটি ক্ষুদ্রঋন তৈরির এবং প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি স্পতাহে একবার করে গিয়ে সেবা দেওয়ার খরচ অনর্ত্মভূক্ত হয়। এ ছাড়াও ‘সেন্টার মিটিং’গুলোর খরচ অনর্ত্মভূক্ত থাকে এই লাভের মধ্যে। যে মিটিং থেকে দলীয় সহায়তা প্রক্রিয়া তৈরি হয়। এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে যে মিটিংয়ে আলাপ করে গ্রাহকের ও তার পরিবারের জীবন মান উন্নয়ন ও ভবিষ্যত ভালো করার ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়। এই লাভের হার মূলত প্রভাবিত হয় যে খান থেকে মাইক্রোফিনান্স প্রতিষ্ঠানটি অর্থ ধার এনে গ্রাহকদের দেয়, সেই প্রতিষ্ঠানের লাভের হারের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানের কাজের ক্ষেত্র বিশেষে মাইক্রোফিনান্সের সুদের হার মূলত ১৮ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে থাকে। মাইক্রোফিনান্স প্রকল্পগুলো বাদ দিলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ধার নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উৎস হল মহাজনরা; যারা ১২০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যনত্ম সুদ নিয়ে থাকে।
 

আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা